Showing posts with label মুক্তিযুদ্ধ. Show all posts
Showing posts with label মুক্তিযুদ্ধ. Show all posts

Saturday, December 9, 2017

কপিলমুনি বধ্যভূমিতে মাছের হাট

পাইকগাছার কপিলমুনি বধ্যভূমিতে ২০১৩ সালে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ কাজ শুরু হলেও অর্থাভাবে মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। চলতি বছর ২৫ মার্চ এমপি আলহাজ্ব শেখ মোঃ নূরুল হক পুনরায় বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেন। তারপর আজও সংস্কার বা পুনঃনির্মাণ শুরু হয়নি।

এদিকে কপিলমুনি বধ্যভূমির এই অসম্পূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভের উপর প্রতিদিন বসছে মাছের হাট।

ছবি তুলেছেন :: মহানন্দ অধিকারী মিন্টু

কপিলমুনি যুদ্ধে পরাজিত ১৫১ রাজাকারের মৃত্যুদণ্ডের দিন আজ

স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও সংরক্ষণ করা হয়নি পাইকগাছার ঐতিহাসিক কপিলমুনি যুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থান। অরক্ষিত রয়েছে রাজাকারদের ব্যবহৃত রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধুর বসতবাড়ী, এমনকি  গণ আদালতের মাধ্যমে কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দিরের সামনে যেখানে একসাথে ১৫১ রাজাকারকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, সেখানে আজও স্থাপন করা হয়নি কোন স্মৃতিস্তম্ভ।


১৯৭১ সালের কপিলমুনির ঐতিহাসিক যুদ্ধের সকল স্মৃতি বিজড়িত স্থান স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের মাধ্যমে সংরণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাসহ এলাকাবাসী। ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর রাজাকারদের আত্মসমর্পণ ও তাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার মধ্যদিয়ে রাজাকার মুক্ত হয় বাণিজ্যিক শহর কপিলমুনি।

আজকের এ দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে কপিলমুনি আঞ্চলিক মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সমিতি কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। আয়োজন করেছে নানান অনুষ্ঠানের। আজ সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সমিতি কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল সাড়ে ৮টায় বিজয় র‌্যালি, সাড়ে ৯টায় পথসভা অনুষ্ঠিত হবে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণারপর দেশের বিভিন্ন স্থানের ন্যায় দণিাঞ্চলেও হত্যা, নির্যাতন ও লুটপাটে মরিয়া হয়ে ওঠে রাজাকাররা। দণিাঞ্চল পাইকগাছার অন্যতম ঘাঁটি হিসাবে রাজাকাররা ব্যবহার করেন বাণিজ্যিক শহর কপিলমুনির প্রাণ কেন্দ্রেই রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধুদের বসতবাড়ী।

বিনোদ বিহারী সাধু ও তার ভাই কুঞ্জু বিহারী সাধু বসতবাড়ীটি ১৯১৬ সালে নির্মাণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর বিনোদ বিহারী সাধু ও তার পরিবার ভারতের কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। আর কপিলমুনির এ বাড়ীতে বসবাস করেন বিনোদের ভাই কুঞ্জু বিহারী সাধু ও তার পরিবার। এলাকার সংখ্যালঘুদের উপর যখন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের অত্যাচর-নির্যাতন ও ধর্মান্তরিত করার প্রবনতা বৃদ্ধি পায় তখন নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য কুঞ্জু বিহারী সাধু ও তার পরিবার এপ্রিল মাসের দিকে পাড়ি জমান ভারতে। স্মরণার্থী হিসাবে তখন তারা আশ্রয় নেন ভারতে।


এদিকে কপিলমুনি ও তার আশপাশ এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য পাকিস্তানের মিলিশিয়া বাহিনী ও রাজাকাররা তাদের ঘাঁটি হিসাবে দখল করে রায় সাহেবদের সু-উচ্চ ও সু-প্রশস্থ দেওয়াল বিশিষ্ট বসতবাড়ীটি। রাজাকাররা এ বাড়িটি অন্যতম ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে কপিলমুনি ও আশপাশ এলাকায় তাদের কর্মকান্ড। প্রায় ২০০ জন রাজাকার ও মিলিশিয়া বাহিনীর সদস্যরা সশস্ত্র অবস্থান নেয় ঘাঁটিতে। এদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে এলাকার সাধারণ মানুষ। অন্যের গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী জোর পূর্বক আনা, তাদের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল।

হিন্দুদের উপর অমানবিক অত্যাচার ও তাদের ধন-সম্পদ লুটসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত ছিল রাজাকাররা। রাজাকাররা জোর পূর্বক মনি সিং, জ্ঞান সিং, নরেন সিং, কানু পোদ্দার, তারাপদ ডাক্তার, জিতেন্দ্রনাথ সিং, শান্তিরাম সাধু সহ অসংখ্য হিন্দুকে তাদের নিজস্ব ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হতে বাধ্য করে।

অত্যাচার ও নির্যাতনের ঘাঁটি হিসাবে কপিলমুনি রাজাকার ক্যাম্পটি পরিচিতি লাভ করে। রাজাকারের এ ঘাঁটিটি ধ্বংস করা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেক কঠিন ছিল। ১১ জুলাই লেঃ আরেফিনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকার ঘাঁটিতে আক্রমন চালায়। কিন্তু প্রথম আক্রমনটি ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে তালা থানার নকশালদের সমবেত চেষ্টায় রাজাকার ঘাঁটির উপর যে আক্রমন হয় সেটিও ব্যর্থ হয়। এতে রাজাকারদের মনবল বেড়ে যায়। যার কারণে এলাকার স্থানীয় লোকজন রাজাকারদের ভয়ে মুক্তিবাহিনীকে সহযোগিতা করতে ভয় পেতো।

এরপর চূড়ান্ত আক্রমনের জন্য পরিকল্পনা তৈরীতে অংশ নেন, রহমত উলাহ দাদু, স.ম. বাবর আলী, ইউনুছ আলী ইনু, সাহিদুর রহমান কুটু, আবুল কালাম আজাদ ও গাজী রফিকুল ইসলাম। কামরুজ্জামান টুকুর পরামর্শে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সদর দপ্তরে বসে কপিলমুনি রাজাকার ক্যাম্প চূড়ান্ত আক্রমের সিদ্ধান্ত হয়। ৩ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর সব কমান্ডার গণ রাড়ুলীতে মিলিত হন এবং ৪ ডিসেম্বর রাত ৩টায় রাজাকার ঘাঁটিতে আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী মুক্তিবাহিনী পৃথক পৃথক ভাবে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে রাজাকার ঘাঁটি। ৫ ও ৬ ডিসেম্বরের পর রাজাকারদের তেজ কমে আসে।

৭ ডিসেম্বর সকাল থেকে মুক্তিবাহিনী নতুন উদ্যামে যুদ্ধ শুরু করে। মাইকের মাধ্যমে রাজাকারদের আত্মসমর্পনের জন্য বলা হয়। ওদের সব পালানোর পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় তখন তারা স ম বাবর আলীর সাথে আলোচনা করার জন্য প্রস্তাব দেয়। বটিয়াঘাটার ওমর ফারুক কৌশলে বাবর আলী সেজে তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। অবাস্তব শর্ত দিলে ব্যর্থ হয় আলোচনা। পুনরায় শুরু হয় প্রাণপণ যুদ্ধ। প্রায় ২ ঘন্টা প্রচন্ড গোলাগুলি হয়। এতে গোলাবারুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় কাবু হয়ে পড়ে রাজাকাররা। এমন সময় কপিলমুনির আকাশে একটি জঙ্গি বিমান উড়তে দেখে ভিতু সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে রাজাকাররা। শেষমেষ বিনা শর্তে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয় রাজাকাররা। তারা দল বেঁধে হাত উঁচু করে আত্মসমর্পন করতে থাকে। কপিলমুনি হাইস্কুল মাঠে রাজাকারদের আত্মসমর্পন দেখতে হাজার হাজার লোক জড়ো হয়।


মোট ১৫৫ জন রাজাকারকে বন্দি করে দড়ি দিয়ে বেঁধে কপিলমুনি হাইস্কুল মাঠে রাখা হয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা রাজাকারদের ইচ্ছেমত মারপিট করতে থাকে। স্থানীয় লোকজনের দাবির প্রেক্ষিতে শেখ কামরুজ্জামান টুকু, গাজী রহমত উলাহ দাদু, ইউনুছ আলী, স ম বাবর আলী, মোড়ল আব্দুস সালাম, শেখ আব্দুল কাইয়ুম সহ কয়েকজনকে নিয়ে গঠন করা হয় গণ আদালত। গণআদালতে সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। 

আটক ১৫৫ জন রাজাকারের মধ্যে দুই জন পালিয়ে এবং দু’জনের বয়স কম হওয়ায় মুক্তি দেওয়া হয়। বাকী ১৫১ জন রাজাকারকে কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দির হাইস্কুলের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গুলি করে গণ  আদালতের রায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। গণ আদালতের এ রায় কার্যকর করার মধ্যদিয়ে পতন হয় রাজাকার ঘাঁটি, রাজাকার মুক্ত হয় কপিলমুনি। 

ঐতিহাসিক এ যুদ্ধে নিহত হন ২ জন, এরা হলেন- ফুলতলার আনোয়ার ও আশাশুনির গোয়ালডাঙ্গার আনসার আলী। আহত হন অনেকেই। যাদের মধ্যে, আগড়ঘাটার তোরাব আলী, গড়ইখালীর রুহুল আমিন, খড়িয়ার আব্দুল খালেক, খুলনার জহুরুল হক বড়খোকা অন্যতম।

১৯৭২ সালের জানুয়ারী মাসে ভারতের স্মরণার্থী শিবির থেকে ফিরে আসেন কুঞ্জু বিহারী সাধুর পরিবার বর্গ। দেশে এসেই ফিরে পান তাদের বসতবাড়ী। বর্তমানে কুঞ্জু বিহারী সাধুর ৪ ছেলের মধ্যে বেঁচে আছেন একমাত্র তপন সাধু। মারা গেছেন ছেলে সাধন, সত্যেন ও তুষার কান্তি সাধু। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহৃত বাড়িটি কুঞ্জু বিহারী সাধুর পরিবার সংস্কার করে বসবাস করছেন।

ছেলে তপন সাধু জানান, নিজেদের এ বাড়ীটি ফিরে পাবো এমন আশা ছিলনা। দেশ স্বাধীন হয়েছে বলেই নিজেদের বাড়িটি ফিরে পেয়েছি, পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছি এটাই স্বাধীনতার সুফল।

এদিকে স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও ঐতিহাসিক কপিলমুনি যুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থান সমূহ সংরণ না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযোদ্ধা ও উপজেলা চেয়ারম্যান এ্যাড. স ম বাবর আলী জানান, দক্ষিণ খুলনার সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী রাজাকার ঘাঁটি ছিল কপিলমুনি। এই ঘাঁটি পতনের পর পুরো দক্ষিণ খুলনা মুক্ত হয়। একবারে ১৫১ রাজাকারের মৃত্যুদণ্ড দেশের আর কোথাও নাই বললেই চলে। এ জন্য কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দিরের সামনে যেখানে রাজাকারদের মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হয় সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করার মাধ্যমে ঐতিহাসিক ওই স্থানটি সংরক্ষণ করা উচিত। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একসময় ঐতিহাসিক এ যুদ্ধ এবং কপিলমুনি মুক্ত হওয়ার ইতিহাস ভুলে যাবে।

--মোঃ আব্দুল আজিজ, পাইকগাছা।

আজ ঐতিহাসিক কপিলমুনি মুক্ত দিবস

জনতার রায়ে প্রকাশ্য দিবালোকে ১৫১ রাজাকারের মৃত্যুদণ্ডের দিন


আজ ৯ ডিসেম্বর, ঐতিহাসিক কপিলমুনি মুক্ত দিবস। পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি ইউনিয়নবাসীর জন্য এক গৌরবময় আনন্দের দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে কপিলমুনির মুক্তিকামী দামাল ছেলেরা পাকহানাদের পরাজিত করে এলাকাটি শত্রুমুক্ত করে। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে ও মার্তৃভুমির টানে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলার অকুতভয় দামাল ছেলেরা।


এই মাঠেই ১৫১ রাজাকারের মৃত্যুদন্ড কার্যকর কারা হয়
যুদ্ধকালীন সময়ে ও তার পুর্বে পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি'সহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় পাক হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস্ এবং শান্তি কমিটির দালালরা লুটপাট থেকে শুরু করে ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায় নিরীহ মানুষের উপর। 


সেদিনের লোমহর্ষক ও বর্বোরোচিত ঘটনার কথা আজও ভুলিনি এলাকার মানুষ। ভয়ংকর রাতের স্মৃতি আর হানাদার বাহিনীর তান্ডবলীলা এখনও প্রবীনদেরকে শিউরে তোলে। উপজেলা সদর হতে ১২ কিঃমিঃ উত্তরে কপোতাক্ষের তীরবর্তী ঐতিহ্যবাহী কপিলমুনির অবস্থিত। প্রতিষ্ঠাতা দানবীর রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু। সে সময় রায় সাহেবের বিশালাকৃতির বাড়ীটি রাজাকাররা সুরক্ষিত দুর্গ হিসাবে বেঁছে নিয়েছিল। মান্দাতা আমলের ঐতিহ্যবাহী এ বাড়িটিকে ঘিরে যুদ্ধের অনেক স্মৃতিচিহ্ন আজও বহন করে চলেছে।

রাজাকাররা তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রাচীর বেষ্টিত দ্বিতল এ ভবনটি তাদের ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত মনে করে গড়ে তুলেছিল রাজাকার ঘাঁটি। প্রায় ২০০ জন রাজাকার সর্বদা নিয়োজিত থেকে যুদ্ধ করেছিল। এলাকার হিন্দু ও নিরীহ লোকদের ধরে এনে নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে আজও শিহরিত হন প্রবীনরা।

১৯৭১ সালে ১১ জুলাই লেঃ আরিফিনের নের্তৃত্বে সরদার ফারুক আহমেদ, আবুবক্কার, শাহজাহান, মাহতাব, লতিফ, আনোয়ার, মনোরঞ্জনসহ আরোও অনেকে কপিলমুনি রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমন চালায়। রাত ৩টা থেকে পরদিন বেলা ৩টা পর্যন্ত চলে একটানা যুদ্ধ।

ঐ সময় খাদ্য, পানীয় ও স্থানীয় লোকজনের সহযোগীতার অভাবে প্রথমবারের অভিযানে রাজাকার ঘাটির পতন ঘটানো সম্ভব হয়নি। এরপর সমন্বিত মুক্তিযোদ্ধাদের ঐক্যমতে শুরু হয় নতুন পরিকল্পনা। আর এরই মধ্যে রাজাকারদের নিষ্ঠুর নির্যাতনের মাত্রা আরো বৃদ্ধি পায়। কথিত আছে, কপিলমুনি বাজারের কৃষ্ণচুড়া বৃক্ষের নীচে জবাই করে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো নিরীহদেরকে। 

রায় সাহেবের বিশালাকৃতির বাড়ীটি রাজাকাররা সুরক্ষিত দুর্গ হিসাবে বেঁছে নিয়েছিল
এদিকে যুদ্ধের নতুন পরিকল্পনার অংশ হিসাবে ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর মুক্তি বাহিনীর দক্ষিণ খুলনার সমস্ত ক্যাম্প কমান্ডারদের একত্রিত করে তাদের মতামত ও যুদ্ধের কলাকৌশল নির্ধারণ করে পুনরায় শুরু হয় যুদ্ধ। ঐ সময় চুড়ান্ত পরিকল্পনায় অংশ নেন গাজী রহমত উল্লাহ দাদু, স. ম. বাবর আলী, ইউনুচ আলী, শাহাদাৎ হোসেন বাচ্ছু, আঃ সালাম মোড়ল, আবুল কালাম আজাদসহ আরোও অনেকে।

৬ ডিসেম্বর রাতে আক্রমণ করা হয় কপিলমুনি রাজাকার ঘাটি। দফায় দফায় চলে আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ। স্থানীয় প্রতাপকাটি কাঠের ব্রীজের উপর ৮ জন রাজাকার, তার একটু পেছনে আরো ৫ জন রাজাকার যুদ্ধে মারা যায়। একেরপর এক মরতে থাকে পাক দোসর রাজাকারদলের সদস্যরা। ৭ ও ৮ ডিসেম্বর একটানা যুদ্ধের পর ৯ ডিসেম্বর সকাল ১১ ঘটিকায় ১৫৫ জন রাজাকার আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়। 


রাজাকারদের পতন ও কপিলমুনি হাইস্কুল মাঠে আত্মসমর্পন এর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে চতুর্দিক থেকে জড়ো হতে থাকে জনতা। উপস্থিত জনতার সমন্বয়ে একটি গন আদালত গঠন করে ১৫৫ জন রাজাকারের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দিরের মাঠে দুপুর ২টায় প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে ১৫১ রাজাকারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর কারার মধ্যদিয়ে মুক্ত হয় পাইকগাছার কপিলমুনি।

উল্লেখ্য, কপিলমুনি মুক্ত দিবসের সঠিক তারিখ ৭ ডিসেম্বর না ৯ ডিসেম্বর এই বির্তক রয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের এক অংশ এতদিন বলেছে ৭ ডিসেম্বর কপিলমুনি মুক্ত দিবস। জানা যায়, ১৯৯২ সালে কপিলমুনি মক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনকারী সহ-অধিনায়ক প্রয়াত মোড়ল আব্দুস সালাম প্রথম এই মুক্ত দিবস পালনের উদ্যোগ নেন এবং ৭ ডিসেম্বর সাড়ম্বরে পালিত হয় ঐতিহাসিক কপিলমুনি মুক্ত দিবস। 

এই মাঠেই জনতার রায়ে প্রকাশ্য দিবালোকে ১৫১ রাজাকারের মৃত্যুদন্ড কার্যকর কারা হয়

পরবর্তীতে কপিলমুনি মুক্ত দিবসের তারিখ নিয়ে তৎকালীন পাইকগাছা থানা আ‘লীগের সাধারন সম্পাদক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত এ্যাড. স,ম ইউসুফ আলী পত্রিকায় বিবৃতি দেন কপিলমুনির মুক্ত দিবসের সঠিক তারিখ ৯ ডিসেম্বর। ফলে বির্তকের সৃষ্টি হয় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে। ফলে দু’টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েন মুক্তিযোদ্ধারা। স্ব স্ব কর্র্মসূচি নিয়ে ৭ ও ৯ ডিসেম্বর কপিলমুনি মুক্ত দিবস পালিত হয় কয়েকবার।

ঐ সময় মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনকারী এক পক্ষের দাবী ছিল, ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর শনিবার রাত ৩ ঘটিকায় অতর্কিতে কপিলমুনি রাজাকারদের এই শক্ত ঘাটিতে আক্রমণ শুরু হয়। ৫ ও ৬ ডিসেম্বর যুদ্ধ চলে। ৭ ডিসেম্বর মঙ্গলবার বেলা ১১টায় রাজাকাররা আত্মসমর্পনে বাধ্য হয়।

তবে মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম জানান, মুক্ত দিবসের তারিখ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে এতদিন যে বিরোধ ছিল তার অবসান ঘটেছে। সবাই বসে তারিখ ঠিক করেছেন ৯ ডিসেম্বর কপিলমুনি মুক্ত দিবস।

Friday, December 8, 2017

গুরুদাসী’র ৯ম প্রয়াণ দিবস আজ

নিরবে পেরিয়ে গেল ৯টি বছর। দেশের জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া মানুষটির কথা কেউ মনে রাখেনি। ২০০৮ সালের ৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে সকলের অগচরে না ফেরার দেশে চলে যান বীরাঙ্গনা গুরুদাসী মন্ডল। 


অথচ তাকে স্মরণ করার জন্য এগিয়ে আসেনি কোনো সামাজিক, রাজনৈতিক বক্তি বা সরকার। আজ অবধি ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়নি তার শেষ স্মৃতি চিহ্ন ইহকালের আবাসস্থল।

বীরাঙ্গনা গুরুদাসী মন্ডল, তুমি পাইকগাছার গর্ব, ভুলবো না তোমায়। কিন্তু মাসি, তুমি হঠাৎ আর এসে বলবে না, ''কেমন আছিস বাবা ? ভালো আছিস তো ? দে কয়ডা টাহা দে, তোরা না দিলি পাব কনে ক।''

Voice of Paikgacha 
বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে তোমাকে!

Thursday, December 7, 2017

পাইকগাছা জাদুঘরে সংরক্ষিত মুক্তিযুদ্ধের জিনিসপত্রের হদিস নেই

পাইকগাছায় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের অভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে উপজেলা জাদুঘর। জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠার পর মূল্যবান জিনিসপত্র সংরক্ষণ করা হলেও গত কয়েক বছরের ব্যবধানে হদিস নেই জাদুঘরে সংরক্ষিত মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত জিনিসপত্রসহ অনেক কিছুরই। নামে মাত্র কিছু জিনিসপত্র থাকলেও অযত্ন অবহেলায় ময়লার মধ্যে পড়ে রয়েছে সেগুলো।


এক সময় জাদুঘরে সংরক্ষিত জিনিসপত্র দেখতে শিক্ষার্থীসহ অসংখ্য মানুষের সমাগম ঘটলেও জাদুঘরের নামটি ভুলতে বসেছে এলাকার মানুষ। এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুক্তিযোদ্ধাসহ এলাকার সচেতন মহল। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জাদুঘরটি পরিচালনা ও যেসব জিনিসপত্রের হদিস নেই তা উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাড. স ম বাবর আলী তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে ১৯৮৫ সালে উপজেলা পরিষদের তত্তাবধায়নে উপজেলা সদরের প্রাণ কেন্দ্রেই ১৪ শতক জমির উপর প্রতিষ্ঠা করেন জাদুঘর ও লাইব্রেরি। দ্বিতল ভবনের উপরের তলায় ব্যবহৃত হচ্ছে শিল্পকলা একাডেমীর কার্যক্রম। আর নীচ তলার একটি কক্ষে লাইব্রেরি ও অপর একটি কক্ষ জাদুঘর হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠার পর সেখানে সংরক্ষণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত অস্ত্র, গোলাবারুদ, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তাক্ত পোশাকসহ মূল্যবান জিনিসপত্র। সংরক্ষণ করা হয়, বিশ্ববরেণ্য বৈজ্ঞানী আচার্য প্রফুল চন্দ্র রায়ের রানী ভিক্টোরিয়ার দেওয়া (স্যার উপাধি প্রাপ্তির) ১টি তরবারী, ২টি খড়গ, নলিনী কান্ত রায় চৌধুরীর রায় সাহেব উপাধি প্রাপ্তির ১টি তরবারী, বঙ্গবন্ধু শিবিরে ব্যবহৃত জাতীয় পতাকা, সমুদ্রের ফেনা থেকে তৈরী পেট, সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও হরিণসহ বিভিন্ন জীব-জন্তুর কঙ্কাল, রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মাওঃ আব্দুল হামিদ খান ভাষানী, জেনারেল এমজি ওসমানী, বিজ্ঞানী পিসি রায়, সু-সাহিত্যিক কাজী ইমদাদুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দ্দী, রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু, দানবীর মেহের মুছুলী, শহীদ এমএ গফুর, দেশের সকল বীর শ্রেষ্ঠসহ বরেণ্য ব্যক্তিদের ছবি। এমনকি বৃটেন, ইন্ডিয়া, পাকিস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশের ধাতব মুদ্রা সংরক্ষিত ছিল। সংরক্ষিত ছিল এলাকার শত শত বছর পূর্বের ব্যবহৃত মাটির জিনিসপত্র।

এক সময় জাদুঘরে সংরক্ষিত এ সব মূল্যবান জিনিসপত্র অসংখ্য মানুষ দূর দূরান্ত দেখতে আসতেন। স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জাদুঘর পরিদর্শন করে জানতে পারতেন মুক্তিযুদ্ধসহ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নানা অজানা তথ্য।

এদিকে জাদুঘরটি ১৯৮৮ সাল থেকে পৌরসভার তত্তাবধায়নে পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের অভাবে অযত্ন অবহেলায় বর্তমানে পড়ে রয়েছে জাদুঘরটি। জাদুঘরের কক্ষটি ভরে আছে ময়লা-আবর্জনায়। অন্ধকার ভুতড়ে পরিবেশ দেখে মনে হবে না জাদুঘরের ওই কক্ষে কেউ কখনো যায়। এমনকি রেজিস্টারে সংরক্ষিত জিনিসপত্রের তালিকা থাকলেও কক্ষে তার অধিকাংশ কিছুই নেই।

জাদুঘরে দায়িত্বরত কর্মচারী আবুল কালাম আজাদ জানান, আমি যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেছি তখন থেকেই রেজিস্টারে তালিকাভূক্ত মূল্যবান অনেক জিনিসপত্র হদিস ছিল না। তবে পিসি রায়ের তরবারীটি নিরাপত্তার জন্য পৌরসভায় সংরক্ষিত আছে বলে তিনি জানান।

এ প্রসঙ্গে  উপজেলা চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. স ম বাবর আলী  বলেন, অনেক আশা নিয়ে জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। ওই সময় অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র সংরক্ষণও করেছিলাম কিন্তু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে মূল্যবান জিনিসপত্রের এখন আর কোন হদিস নেই। এ গুলো নিয়ে কেউ ভাবেই না। অথচ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জাদুঘরে সংরক্ষিত জিনিসপত্র গুলো অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত জিনিনপত্র দেখে মুক্তিযুদ্ধের নানা দিক জানতে পারতো।

তবে এখনো যেসব জিনিসপত্রের হদিস নেই, তা উদ্ধার করে জাদুঘরটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত করতে পারলে আবারও জাদুঘরের পূর্বের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন স ম বাবর আলী।

--মোঃ আব্দুল আজিজ, পাইকগাছা। 

Tuesday, December 5, 2017

স্মৃতিপটে বীরাঙ্গনা গুরুদাসী মন্ডল (১ম পর্ব)

স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ একজন গুরুদাসী


আমার স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ ধ্বসে গেছে! হ্যা, বাংলাদেশের স্বাধীনতার এক অনন্য স্মৃতিস্তম্ভকে আমরা হারিয়েছি। হারিয়েছি গুরুদাসীকে- স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ গুরুদাসী মন্ডল'কে। আর দেখা হবে না তার সাথে। 'কনে ছিলিরে' বা 'কনে আছলি' বলে অট্টহাসি দেবে না, ডুঁকরে ডুঁকরে কাঁদবেও না আর কোন দিন। 'দাঁড়া' বলে পরম মমতায় উদাস নয়নে তাকিয়ে থাকবে না- আমার মা, আমার বোন, আমার মেয়ে গুরুদাসী! গুরুদাসী মরে গেছেন!! 


গুরুদাসীর বাড়ি পইকগাছা উপজেলার দেলুটি ইউনিয়নের ফুলবাড়ি গ্রামে। স্বামীর নাম গুরপদ মন্ডল। স্বামী পেশায় ছিলেন দর্জি। দর্জি হলেও সবার কাছে ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র। স্বাধীনতাকামী অত্যন্ত সহজ সরল মানুষ ছিলেন তিনি। ২ ছেলে ২ মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে ছিল তাদের সুখের সংসার।

রাজাকারদের ইন্ধনে পাকসেনারা তার বাড়িতে হামলা চালায়। একে একে পরিবারের সব সদস্যকে বাড়ির উঠানে জড়ো করা হয়। গুরুপদ মন্ডলের স্ত্রী গুরুদাসী মন্ডলের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি পড়ে পাক সেনাদের। নিজ স্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষা করতে এগিয়ে এলে গুরুদাসীর সামনেই গুলি করে হত্যা করা হয় তার স্বামী, ২ ছেলে ও ১ মেয়েকে। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাদের মৃতদেহ বীভৎস করে দেয়া হয়। এরপর গুরুদাসীর কোলে থাকা দুধের শিশুকে মাতৃক্রোড় থেকে কেড়ে নিয়ে হত্যা করা হয়। মায়ের সামনেই তাকে পুঁতে ফেলা হয় বাড়ির পাশে কাঁদা পানির ভেতরে। তারপর গুরুদাসীর ওপর হায়েনারা পাশবিক নির্যাতন শুরু করে।

পাক হানাদার সেনারা চলে গেলে, মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসী গুরুদাসীকে উদ্ধার করেন। মুক্তিযোদ্ধারা যখন উদ্ধার করেন, গুরুদাসী তখন জীবন্মৃত। তার দেহের খোলসটাই ছিলো শুধু। নিজ চোখের সামনে স্বামী, ছেলে-মেয়ের মৃত্যু এবং পাক সেনাদের হাতে সম্ভ্রম হারিয়ে গুরুদাসী পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। মুক্তিযোদ্ধারা গুরুদাসীকে উদ্ধার করে তাদের হেফাজাতে রাখেন।

দেশ স্বাধীনের পর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। মানসিক ভারসাম্যহীন গুরুদাসী দেশের বিভিন্ন জায়গায় উদবাস্তের মতো ঘুরে এক সময় ফিরে আসেন স্বামী-সন্তানের স্মৃতি বিজড়িত পাইকগাছায়। স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজের পরিবার ও স্বজনদের হারিয়ে বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে তিনি তার চারপাশকে আপন করে নেন।

পাইকগাছা কপিলমুনির রাস্তায় পাগলের মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন গুরুদাসী মন্ডল। প্রতিবেশীর দরিদ্র সন্তানকে তিনি অতি স্নেহে বড় করছেন। মাঝে মাঝে খুলনা শহরের পিকচার প্যালেস, কেডি ঘোষ রোড এলাকায় নিঃস্ব এই বীরাঙ্গনা পথে পথে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াতেন।

তার এলাকায় অসম্ভব জনপ্রিয় ছিলেন গুরদাসী। তিনি উপকথার নায়িকার মতো সবার একান্ত আপন। সব হারিয়েছেন যে দেশের জন্য, সেই দেশ গুরুদাসীকে কিছুই দিতে পারেনি। অবশ্য যে সব রাজাকার নির্যাতন করেছিল, তারা সবাই বহাল তবিয়তে আছে। ইতিহাসের নিষ্ঠুর প্রহসন! এখনও সেই রাজাকাররা প্রতারিত করে চলছে দেশের মানুষকে।

স্বাধীনতার ৩৭ বছর পর ২০০৮ সালেরে ডিসেম্বর মাসে তার অন্তিম যাত্রা হয়তো আমাদের নিস্প্রভ নিস্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ অভিমান, হয়তো স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন করে রাজাকারের উত্থানের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ!

গুরুদাসী, তুমি ৭১ থেকে আজ এবং অনন্তকাল বাংলার স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে বেঁচে ছিলে, স্মৃতিস্তম্ভ হয়েই বেঁচে থাকবে!

বঙ্গজননীর বুকে চিতার ভস্ম গুরুদাসী, তোমায় অভিবাদন, সালাম, নমস্কার
!