সম্প্রতি গ্রামীণফোন বেশি বেশি কথা বলায়
উৎসাহিত করে তাদের গ্রাহকদের সঙ্গে একটি অভিনব প্রতারণা করেছে। দেশের
সর্ববৃহৎ এই মোবাইল অপারেটর গ্রাহকদের সঙ্গে এমন প্রতারণা করতে পারে এটা
আমি কখনো চিন্তাও করতে পারিনি। কিন্তু বাস্তবতা হল আমি নিজেই তাদের এই ফাঁদে পা দিয়ে ধরা খেয়েছি !!!

গত মে মাস জুড়ে রেডিও, টিভি ও পত্রিকায় প্রচারিত ও প্রকাশিত ব্যবহারের
ভিত্তিতে ১০০০ টি আকর্ষণীয় স্মার্টফোন জিতে নেয়ার গ্রামীণফোনের লোভনীয়
বিজ্ঞাপনের ফাঁদের পড়ে আমি তাদের উক্ত ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করি।
ক্যাম্পেইনের শর্ত ছিল এপ্রিল মাসের তুলনায় মে মাসে ১০০ টাকা বা তার বেশি
টাকার লোকাল ভয়েস কল করলে সর্বোচ্চ ব্যবহারের ভিত্তিতে ১০০০ জন
ব্যবহারকারী পাবে স্যামসাং গ্যালাক্সি এস ফোর, গ্যালাক্সি এস থ্রি,
গ্যালাক্সি নোট টু, সনি এক্সপেরিয়া জেড ও নোকিয়া লুমিয়া ৯২০ সহ ১০০০ টি
আকর্ষণীয় স্মার্টফোন। এছাড়া প্রতিদিনের সর্বোচ্চ ৩ জন ব্যবহারকারী (লোকাল
ভয়েস কল) পাবে ৩ টি করে গ্যালাক্সি এস ফোর। প্রতিদিনের বিজয়ীদের
ক্ষেত্রে একবারের বিজয়ী দ্বিতীয়বারের জন্যে বিবেচিত হবে না। তবে
ক্যাম্পেইন শেষে সর্বোচ্চ ব্যাবহারের ভিত্তিতে ১০০০ টি স্মার্টফোন জেতার
সুযোগ তার জন্যেও প্রযোজ্য থাকবে। সঙ্গে ছিল ১০০ টি জিপি-জিপি ফ্রি এসএমএস।
এই ফ্রি এসএমএস গুলি দেয়ার কথা ছিল জুন মাসে এবং স্মার্টফোন দেয়ার কথা
ছিল জুলাই মাসে।
একদিনের সর্বোচ্চ ৩ জন ব্যবহারকারীর একজন হবার
লক্ষ্যে গত ২৯ মে তারিখে আমি সারাদিন অবিরাম (২৪ ঘন্টা) কথা বলে প্রায় ৩
হাজার টাকার লোকাল ভয়েস কল ব্যবহার করি। এরপর ফলাফল জানতে আমি তাদের
কাষ্টমার ম্যানেজারদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে (অনলাইন চ্যাট, ১২১ এ কল এবং
স্ব-শরীরে গ্রামীণফোন সেন্টারে গিয়ে) যোগাযোগ করি। কিন্তু একেক কাষ্টমার
ম্যানেজার একেক রকম তথ্য দিয়ে আমাকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। তাদের কেউ বলেন
প্রতিদিনের বিজয়ী একজন, কেউ বলেন একজনও না আবার কেউ বলেন তিনজন। কেউ বলেন
ফলাফল বিজয়ীদের মোবাইলে এসএমএস করে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, কেউ বলেন এখনো
ফলাফল জানানো হয়নি।
ক্যাম্পেইনের শর্তানুসারে জুন মাসে আমার
মোবাইলে ১০০ টি ফ্রি এসএমএস আসার কথা ছিল। কিন্তু ২৩ জুন তারিখ পর্যন্ত
কোনো এসএমএস না পেয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা আমাকে একটি লিখিত
অভিযোগ দিতে বলেন। লিখিত অভিযোগ দাখিলের পর ২৬ জুন তারিখে আমার মোবাইলে ১০০
টি ফ্রি এসএমএস আসে।
এরপর জুলাই মাসে হ্যান্ডসেটের ব্যাপারে
খোঁজ-খবর নিতে গেলে কেউ বলেন পুরস্কার দেয়া হবে হেড অফিস থেকে, কেউ বলেন
গ্রামীণফোন সেন্টার থেকে আবার কেউ বলেন বড় একটি অনুষ্ঠান করে পুরস্কার
দেয়া হবে। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে যোগাযোগ করলে তারা বললেন পুরস্কার
দেয়া হবে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে। মাঝামাঝি সময়ে যোগাযোগ করলে বললেন
জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে পুরস্কার দেয়া হয়ে গেছে।
২৯ মে তারিখে
২৪ ঘন্টা অবিরাম কথা বলেও কেন আমি প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হতে পারলাম না
আর সেদিনের বিজয়ী কারা এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে তারা আমাকে আরো একটি
লিখিত অভিয়োগ দিতে বলেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে আমাকে
বিভ্রান্ত করার কারণে এবং আমার সঠিক ফলাফল জানতে আমি ১৪ জুলাই তারিখে একটি
লিখিত অভিযোগ দাখিল করি। কিন্তু দুখঃজনক হলেও সত্যি যে, আজ পর্যন্ত
গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ করেনি।
যোগাযোগ না করার কারণ জানতে সর্বশেষ ২৮ জুলাই তারিখে আমি আবারও মতিঝিলের
গ্রামীণফোন সেন্টারে যাই। এবারের কাষ্টমার ম্যানেজার (শায়লা) কম্পিউটারে
রেকর্ড দেখে নিয়ে আমাকে জানালেন যে, ২৪ তারিখে আমার মোবাইলে অসংখ্যবার
চেষ্টা করেও নাকি আমাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। আমি বললাম, ফোনে আমাকে না
পাবার কোনো কারণ নেই। কারণ, ২৪ তারিখে আমার মোবাইল ২৪ ঘন্টাই চালু ছিল এবং
আমি নিজেও সারাদিন আপনাদের ফোনের অপেক্ষায় ছিলাম। এমন কি নামাজের সময়েও
ফোন বন্ধ না রেখে বরং সাইলেন্ট করে রেখেছি। তবুও আপনাদের রেকর্ডে যেহেতু
লেখা আছে আমাকে ফোনে পাওয়া যায়নি, সেহেতু আমি ধরেই নিলাম যে আমাকে পাওয়া
যায়নি। সেক্ষেত্রে আমার অভিযোগের জবাবটিও নিশ্চয়ই আপনাদের রেকর্ডে লেখা
থাকার কথা। লিখিত জবাবটি বলুন আমি শুনি। এবার তিনি কী জবাব দিবেন তা বুঝতে
না পেরে ২৪ তারিখে আমার সঙ্গে যার যোগাযোগ করার কথা ছিল তার কাছে ফোন
করলেন।
বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে তিনি আমার কাছে আমার কাছে জানতে
চাইলেন যে, আমি আসলে কী জানতে চাই। আমি বললাম, ২৯ মে তারিখে আমি ২৪ ঘন্টা
অবিরাম কথা বলেছি। বলতে গেলে একশ নম্বরের পরীক্ষায় আমি ১০০ টি পশ্নেরই
সঠিক উত্তর দিয়েছি। অথচ আপনারা বলছেন যে আমি বিজয়ী হইনি। সেক্ষেত্রে আমি
এই ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি। ব্যবহারের ভিত্তিতে ঐদিন আমার অবস্থান কততম
সেটি জানতে চাই এবং ঐদিনের তিনজন বিজয়ী কারা কারা সেটিও জানতে চাই। আমি
পরাজিত প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী প্রার্থীদের অভিনন্দন জানাতেই চাই। এবার
তিনি বললেন যে, তারা এক গ্রাহকের তথ্য আরেক গ্রাহককে দেন না। আর কেউ যদি
বিদেশে কল করে ২৪ ঘন্টা কথা বলে থাকে সেক্ষেত্রে তারাই প্রথম, দ্বিতীয় এবং
তৃতীয় হয়েছে। আমি বললাম, আপনি তো আপনাদের ক্যাম্পেইনের শর্ত সম্পর্কে
কিছুই জানেন না। ক্যাম্পেইনের শর্তে বিদেশের কল প্রযোজ্য ছিল না, ছিল শুধু
লোকাল ভয়েস কলের কথা। এবার তিনি আমার কথার আর কোনো জবাব দিতে না পেরে আমার
আরও কোনো অভিযোগ থাকলে তা লিখিত আকারে জমা দিতে বলেন। তার কথামতো আমি আরো
একটি লিখিত অভিযোগ তার কাছে জমা দেই। ৮ আগষ্ট তারিখের মধ্যে আমার অভিযোগের
জবাব দেয়া হবে বলে তিনি জানান। আর পুরস্কার বিতরণের ব্যাপারে জানতে চাইলে
তিনি জানান যে, তাদের বিভিন্ন সেন্টারগুলো থেকে বিজয়ীদের পুরস্কার দেয়া
হচ্ছে। অথচ দীর্ঘসময় অপেক্ষা করেও সেখানে আমি পুরস্কার বিজয়ী কাউকেই
খুঁজে পাই নি। পরে বুঝলাম এটিও তাদের মনগড়া কথা।
এখন সর্বশেষ
আপডেট হচ্ছে- তাদের দ্বিতীয় প্রতিশ্রুত ৮ আগষ্ট তারিখেও তারা আমার সঙ্গে
কোনো যোগাযোগ করেনি। যদিও আমি অনেকটাই নিশ্চিত ছিলাম যে এবারও তারা আমার
সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করবে না। কারণ, এপর্যন্ত আমার কোনো প্রশ্নেরই সন্তোসজনক
জবাব তারা দিতে পারেননি।
পুরো ঘটনা থেকে আমি এখন পুরোপুরি
নিশ্চিত যে, প্রকৃতপক্ষে দামী এই স্মার্টফোনগুলি গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ
কখনোই কাউকে দেয়নি এবং দেবেও না। আর যদি লোক দেখানোর জন্যে দু’একজনকে
দিতেও হয় তবুও সেটা তাদের নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে বলেই আমার ধারণা।
ফলাফল জানতে আমার মতো যারাই যোগাযোগ করেছে, তাদের সবাইকে একটি কথাই বলে
দেয়া হয়েছে, ‘বিজয়ীদের মোবাইলে এসএমএস করে ফলাফল জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
আপনি যেহেতু এসএমএস পাননি, সেহেতু আপনি পুরস্কার জিতেননি’. তাদের সবার এই
একটিমাত্র বাক্য ছাড়া আর একটি বাক্যেও কারোর সঙ্গে কারোর মিল আমি খুঁজে
পাইনি।
লেখক: হুমায়ুন কবির বিদ্যুৎ, ব্লগার, প্রথম আলো ব্লগ